২০২৬ সালের ২০ জুলাই, নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে, ৩৯ বছর বয়সী মেসি বিশ্বকাপের দিকে শেষ ঝাঁপ দিয়েছিলেন। প্রায় পুরো ম্যাচ স্পেনের চাপে থাকা আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে গোল খেয়ে শিরোপা রক্ষা করতে পারেনি।
শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি একা ঘাসের ওপর অনেকক্ষণ বসেছিলেন, জোর করে একটু হাসি চেপে ধরে। কিন্তু রানার্স-আপ মেডেল হাতে নেওয়ার মুহূর্তে চোখের জল আর আটকানো যায়নি।

৩৯ বছর ২৬ দিন, ছয়টি বিশ্বকাপ, এক চ্যাম্পিয়নশিপ, দুই রানার্স-আপ, ৩৪ ম্যাচ, ২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট—ইতিহাসের সর্বাধিক উপস্থিতি ও অ্যাসিস্টের রেকর্ড সব তাঁর নামে। টানা নয় ম্যাচে বিশ্বকাপে গোল, এবং ছয়টি বিশ্বকাপেই অ্যাসিস্ট করা প্রথম খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপের জন্য এটাই তাঁর সব উত্তর।

গল্পের শুরু পাম্পাসের রোসারিও থেকে। সেখানেই মেসির জন্ম; বাবা কারখানার শ্রমিক, মা একসময় পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল; পাঁচ বছর বয়সে এলাকার যুব দলে যোগ, সাত বছরেই রাস্তার ছোট্ট রাজা।
এখনও সেই কিংবদন্তি ঘুরে বেড়ায়: এক রোগা, লাজুক ছেলে, নিজের চেয়ে বড় শরীর ও বয়সের দলের মাঝে বল নিয়ে ছুটছে—প্রতিদিনের কাজ শুধু প্রতিপক্ষের পুরো দল ডিবল করে গোল, আবার ডিবল করে গোল।
মাঠের বাইরে বড়রা মেসিকে দেখে অবাক হয়ে বলত—“অসাধারণ প্রতিভা, পরের ম্যারাডোনা”; মাঠের ভেতরে অন্য ছেলেরা শুধু বলত—“বলটা দাও, আমি বাড়ি যাব”…
এটা হওয়ার কথা ছিল এক প্রতিভাবান কিশোরের ধাপে ধাপে শীর্ষে ওঠার গল্প। কিন্তু এগারো বছর বয়সে “গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি”র রোগনির্ণয় সেই রাস্তা কেটে দেয়। চিকিৎসক দুঃখভরে বলেন: দুই হাজারের মধ্যে এক—মেসির উচ্চতা ও শরীরের বৃদ্ধি এগারোতেই আটকে যেতে পারে।
রোগ অচিকিৎস্য নয়; প্রতিদিন গ্রোথ হরমোন ইনজেকশন লাগে, মাসে খরচ প্রায় ৯০০ ডলার। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ সেই খরচ দিতে রাজি হয়নি।
ভাগ্যক্রমে এজেন্ট মিংগেলা মেসি বাবা-ছেলেকে বার্সেলোনার দুটি সরাসরি টিকিট এগিয়ে দেন। শেষ আশায় তারা ইবেরিয়ান উপদ্বীপে উড়ে যান—আর সেই আশা সত্যি জ্বলে ওঠে। ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর বার্সার তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর রেক্সাচ মাত্র দশ মিনিট দেখেই ন্যাপকিনে চুক্তি করে ফেলেন।
ছোট মেসি ব্যথা সহ্য করে প্রতিদিন নিজেই ইনজেকশন নিতেন, পায়ে কঠোর ট্রেনিং করতেন। সাক্ষাৎকারে সেই কষ্টের কথা খুব কম বলেন; শুধু বলেন: “প্রতিবার নো ক্যাম্পের সিঁড়ি বেয়ে উঠে হঠাৎ উজ্জ্বল মাঠের আলো দেখি—সেই মুহূর্তেই শৈশব মনে পড়ে। কেউ জিজ্ঞেস করলে ফুটবলে সফলতা কীভাবে আসে, মাথায় শুধু দেয়ালের দিকে বারবার বল মারা ও ধরার ছবি ভাসে।”
ধীরে ধীরে তিনি বার্সেলোনায় পা পাতেন, জাতীয় জার্সিও গায়ে পড়েন। ২০০৫-এ মেসি আর্জেন্টিনা ইউ-২০ নিয়ে বিশ্বযুব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন, গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট দুটোই। ২০০৬-এ উনিশ বছর বয়সে জার্মানি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ১৯ নম্বর জার্সি নিয়ে হাজির।
গ্রুপ পর্বে সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনিগ্রোর বিপক্ষে বদলি হয়ে মাত্র ষোলো মিনিটে অভিষেক গোল। সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে হারে; পেনাল্টি শুটআউটে মেসি মাঠেই নামেননি। তবু সবাই জানত—মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা তখনো শুরু মাত্র।
২০০৬-এর পর তিনি ধীরে ধীরে সুপারস্টারের পথে হাঁটেন। ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল, কোপা দেল রে সেমিফাইনালে বার্সা বনাম হেতাফে। মেসি নিজের অর্ধে বল নিয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত রান শুরু করেন—পাঁচ রক্ষণভেদ করে গোলরক্ষককেও পেরিয়ে খালি গোলে ঠেলে দেন।
সেই বছরেই প্রথম এল ক্লাসিকোতে হ্যাটট্রিক—তিনবার পিছিয়ে থেকে তিনবার সমতা, একাই বার্নাবাউতে পুরো রিয়ালের মুখোমুখি। তখন সারা বিশ্ব বলছিল: এই ছেলেই ম্যারাডোনার সত্যিকার উত্তরসূরি।
২০০৮-এ গার্দিওলা আসেন, রোনালদিনহো চলে যান, মেসি পরেন ১০ নম্বর। একটা আসল যুগের শুরু।

২০০৯—কসমিক টিমের প্রথম বছর। সেই বার্সা টিকি-টাকাকে শিল্পে পরিণত করে। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ২-০ হারিয়ে মেসি এক অসাধারণ হেডেড লব দিয়ে ফান দ্য সারকে নিরুত্তর করে দেন। সেই বছর তারা ঐতিহাসিকভাবে লা লিগা, কোপা দেল রে, চ্যাম্পিয়নস লিগ, স্প্যানিশ সুপার কাপ, ইউরোপীয় সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ—ছয় খেতাব একসাথে। মেসিও বছরের শেষে প্রথম ব্যালন ডি’অর তুলে নেন।
ক্লাব ও ব্যক্তিগত সম্মানের ঢেউয়ের মাঝেই আসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০১০-এ ব্যালন ডি’অর জয়ীর আলো নিয়ে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর পরেন মেসি। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় ভুভুজেলা বাজলেও আর্জেন্টিনা শূন্য হাতে ফেরে; মেসির কোনো গোল নেই, জার্মানি দলকে গুঁড়িয়ে দেয়। তখন তাঁর বয়স ২২—জাতীয় দলের কেন্দ্র হিসেবে প্রথমবার হারের তিক্ততা।
বার্সায় ফিরে সম্মানের ঝরনা থামেনি: ২০০৯-১০ লা লিগা, ২০১০-১১ লা লিগা, ২০১১-১২ কোপা দেল রে, ২০১২-১৩ লা লিগা, দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর, তৃতীয় ব্যালন ডি’অর…
পাগল ২০১২-এ পৃথিবী মেসির গোল আটকাতে পারেনি। মার্চে চ্যাম্পিয়নস লিগে লেভারকুজেনের বিপক্ষে এক ম্যাচে পাঁচ গোল—ইতিহাসে প্রথম। মে মাসে মালাগার বিপক্ষে ডাবল করে গার্ড মুলারের এক সিজনে ৪০ গোলের রেকর্ড ভাঙেন, লা লিগা গোল্ডেন বুটকে ৫০-এ তুলে দেন। বছর শেষে মুলারের বার্ষিক ৮৫ গোলের রেকর্ড পায়ে মাড়িয়ে ব্যক্তিগত বার্ষিক গোল ৯১-এ পৌঁছান… চতুর্থ ব্যালন ডি’অরও স্বাভাবিকভাবেই তাঁর হাতে।
২০১৩-এ একসময় চোট, কিন্তু ফিরে এসেও তিনি ব্যালন ডি’অর জয়ীই। তারপর অপেক্ষা, অপেক্ষা—২০১৪ বিশ্বকাপ এসে যায়।
২০১৪, ব্রাজিল বিশ্বকাপ। মেসি ছোট চুল রাখেন, চোখে শুধু লড়াই। গ্রুপের তিন ম্যাচে চার গোল—বসনিয়ার বিপক্ষে দূরপাল্লার শট, ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোল, প্রতিটিই বিস্ফোরক। তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন, ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু তাঁর ভাগে থাকে শুধু সেই চিরস্মরণীয় “এক পা দূরে”—পডিয়ামে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা ও হতাশার চোখ ক্যামেরায় ধরা পড়ে; ট্রফি হাতছাড়া।
অন্যদের চোখে ২৭ বছর বয়সী মেসির এখনো সময় আছে। কিন্তু মেসি জানতেন—আরও এগোতে হলে নিজেকে আরও গভীরে গড়ে তুলতে হবে।

ক্যারিয়ারের প্রথম পর্ব মনে করলে আসে দিকবদল, ডিবল, ওয়ান-ম্যান শো, বাঁ পায়ে অদ্বিতীয় দক্ষতা—আর অনেক মিস করা ওয়ান-অন-ওয়ান। এ ক’টা অস্ত্রেই তিনি বিশ্ব জয় করতে পারতেন; তার বাইরে খুব কম কিছু মনে থাকে।
আর পরের মেসির কথা? থ্রু-বল? লং পাস? সংগঠন? নিয়ন্ত্রণ? দূরপাল্লার শট? চতুর ফিনিশ? বাঁ পা? ডান পা? ফ্রি-কিক? আর কী বাকি ছিল?
জাভি একবার বলেছিলেন, “মেসি প্রতিদিনই উন্নতি করেন”—আর সেটা সত্যিই ঘটেছে।

—২০০৮-০৯ সিজনে মেসি ফ্রি-কিক নিয়ে কঠোর অনুশীলন শুরু করেন। আগে ডান পায়ে ভারসাম্য প্রায় জুতার বাইরের কিনারায় থাকত, স্থিতিশীলতা নষ্ট হত। পরে নতুন স্ট্রাইড ও ফোর্স পদ্ধতি খুঁজে পেয়ে ফ্রি-কিককে পেনাল্টির মতো নিতে শুরু করেন।
—২০১৪-১৫ সিজনে ইচ্ছাকৃতভাবে ডান পা গড়ে তোলেন। “অকেজো পা” চলে যায়, চিপ শট বিশ্বজোড়া সুনাম পায়। সেই সিজনে ডান পায়েই এগারো গোল—শুধু সেই পা দিয়েই লা লিগা স্কোরার তালিকার শীর্ষ কুড়িতে ঢোকা সম্ভব।
মেসি কখন নতুন স্কিল যোগ করেছেন, সেদিকে তাকালে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০০৭-০৮-এ টানা মাংসপেশীর চোটে বাদ পড়ে তিনি ধীরে ধীরে সেই ক্ষতিকর ওয়ান-ম্যান রান কমিয়ে দেন; ২০১৩-১৪-এ বার্সা তিন ফ্রন্টে শিরোপা হারায়, তিনি ডান পা তুলতে শুরু করেন, পরের সিজনে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ গড় খেলার সময় পান।
সংক্ষেপে—দল দুর্বল হলেই মেসি নিজেকে আরও গভীরে তৈরি করেন।

২০১৭-১৮ সিজন শেষে ইনিয়েস্তা ও নেইমার চলে যান, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড বয়সী হয়ে ওঠে; মেসি আরও পেছনে নেমে বল নিতে শুরু করেন, লং পাস দক্ষতা জ্বালিয়ে তোলেন—৩০ মিটারের বেশি পাসের নির্ভুলতা ৭২%, পুরোপুরি এক টপ-ক্লাস মিডফিল্ডারের মান।
অস্ত্রাগার যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেই আসে চতুর্থ বিশ্বকাপ।

২০১৮, রাশিয়া। ৩১ বছর বয়সী মেসি তখন দাড়ি রেখেছেন। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জীবন-মরণ লড়াইয়ে এক কন্ট্রোল-অ্যান্ড-শুট দিয়ে আর্জেন্টিনাকে পাহাড়ের কিনারা থেকে টেনে তোলেন। কিন্তু তারপর তরুণ ফ্রান্সের মুখে এমবাপ্পে ঝড়ের মতো এসে পাম্পাসের শেষ অহংকারও উড়িয়ে দেন।
শেষ বাঁশির পর মেসি মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন—চোখ ফাঁকা।

তারপর ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকারের সেই কমেন্টারি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়:

“এটা নিশ্চয়ই মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।”

২০২১ সালের আগস্টে ফুটবল বিশ্বকে কেঁপে ওঠা খবর: মেসি প্যারিস সেন্ট-জার্মাঁতে যোগ দিচ্ছেন।

নো ক্যাম্পে প্রেস কনফারেন্সে কথা বলার আগেই চোখে জল। একুশ বছর, ৭৭৮ ম্যাচ, ৬৭২ গোল, ৩৫ খেতাব, দশ লা লিগা, চার চ্যাম্পিয়নস লিগ, ছয় ব্যালন ডি’অর। যে গল্প ন্যাপকিনে শুরু হয়েছিল, শেষ হয় টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে।
নেইমার, এমবাপ্পে আর মেসি—“এমএমএন” ত্রয়ী কাগজে অবিশ্বাস্য। বাস্তব কিন্তু অন্য রকম।

লিগ ১-এর প্রথম সিজনে মেসি মাত্র ছয় গোল; চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউটে রিয়ালের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস, পিএসজির উল্টে হেরে বিদায়। ভক্তরা হুইসেল বাজায়, ফরাসি মিডিয়া সমালোচনা করে—তখন তিনি সপ্তম ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, কিন্তু প্যারিসের চোখে তিনি “ফর্ম হারানো প্রবীণ”।
২০২২ বিশ্বকাপে মেসি আবার নামেন। সৌদি আরবের কাছে হার থেকে গ্রুপ উত্তরণের সংকট—নভেম্বরে খুব কম মানুষই আর্জেন্টিনার শিরোপার আশা রেখেছিল।
কিন্তু নকআউটে সব বদলে যায়। একদিকে মেসি নিজের সর্বোচ্চ স্তর দেখান; অন্যদিকে পুরনো বন্ধু দি মারিয়ার সাথে স্বপ্ন পূরণ, বিগ মার্টিন ও দে পাউলোর প্রাণপণ রক্ষা, এনজো, ম্যাকঅ্যালিস্টার, আলভারেজ—আইডলের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে…
শেষে আমরা দেখি একটা দল—মিলমিশে গড়া, কৌশলে স্পষ্ট, ঐক্যবদ্ধ, কখনো হার না মানা আর্জেন্টিনা। ফাইনালে মেসি ও প্যারিসের সহকর্মী এমবাপ্পের মধ্যে দেবতাদের লড়াই। শেষ পর্যন্ত মেসি আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পাম্পাসের উড়ান দেখান।
ট্রফি তোলার সেই মুহূর্তে ব্যক্তিগত বিশ্বকাপ গোলও ১৩-এ পৌঁছায়—পেলেকে ছাড়িয়ে দক্ষিণ আমেরিকান খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ গোলরেকর্ড তাঁর নামে।
সবাই ভেবেছিল, এবার গল্প শেষ। বিশ্বকাপ আছে, কোপা আমেরিকা আছে, আট ব্যালন ডি’অর হাতে। এই মুহূর্তে অবসরই সবচেয়ে নিখুঁত সমাপ্তি।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে মেসি ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেন। তখন জনমত ছিল—তিনি টাকা উপার্জন করতে এসেছেন, পাশাপাশি আমেরিকার বাজার গড়তে; প্রতিযোগিতামূলক ফর্ম রাখা কেবল অনেক কারণের একটি।
তিনি কি সত্যিই ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে চান?

কিন্তু ঘটনা অন্য পথে মোড় নেয়।

২০২৪ সিজনে এমএলএসে ২৫ ম্যাচে ২০ গোল। সহকর্মীদের নিয়ে লিগস কাপ জেতেন, এমএলএস রেগুলার সিজনের এক সিজনে গোল-অংশগ্রহণ রেকর্ডও ভাঙেন—৩৬; বললেই ভাঙা।
২০২৫-এ তিনি এমএলএস ইতিহাসে কেউ না করা কাজ করেন। রেগুলার সিজনে ২৮ ম্যাচ, ২৯ গোল, ১৯ অ্যাসিস্ট—টানা দুই বছর এমভিপি। তারপর প্লেঅফে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান; ফাইনালে দুই অ্যাসিস্ট দিয়ে ৩-১-এ ক্লাবের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ।
আরেক রেকর্ডও জন্ম নেয়: এমএলএস ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত ৫০ গোল—মাত্র ৫৩ ম্যাচে। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ম্যাচে এক গোল; তখন তাঁর বয়স ৩৮।
বিশ্ব অবাক; মেসির পাশের মানুষরা নন।

গত বছর আর্জেন্টিনার ফিজিওথেরাপিস্ট ওয়াল্টার ইনসাউরাল্দে মিয়ামিতে মেসির সাথে কাজ করেছেন—রেজিস্ট্যান্স, স্প্রিন্ট, শক্তি ও ফিটনেস তীব্র করেছেন।
মেসির সাথে মিয়ামিতে আসা দে পাউলো বলেন: “আমরা প্রতিদিন ক্লাব ট্রেনিংয়ের বাইরেও প্রোগ্রাম চালাই,” “শরীরকে সর্বোচ্চ সীমায় ঠেলে দিচ্ছি, যাতে শারীরিকভাবে সেরা অবস্থায় থাকি।”
এসবই ২০২৬ মার্কিন-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপের জন্য। মেসির আর কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই; তবু আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দিলেই লড়াইয়ের আগুন জ্বলে ওঠে।
২০২৬ সালের ১৬ জুন, কানসাস সিটি। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সী মেসি ব্যক্তিগত ষষ্ঠ বিশ্বকাপের অভিষেকে, জাতীয় দলের ২০০তম ম্যাচের রাতে হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকে হতবাক করেন। সেদিন তিনি ক্লোজের ১৬ গোলের রেকর্ডে সমান হন—ইতিহাসের শীর্ষে যৌথভাবে। সেদিনই ২০০৬-এর অভিষেক গোলের ঠিক বিশ বছর পূর্ণ হয়।
গ্রুপের দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ডাবল করে ১৮ গোলে ক্লোজকে ছাড়িয়ে একা বিশ্বকাপের সর্বকালের শীর্ষ স্কোরার। টানা ছয় ম্যাচে গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায়ও নাম ওঠে—ফন্টেইন ও জাইরজিনহোর রেকর্ডে সমান।
শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ০-২ পিছিয়ে। প্রথমার্ধে মেসি এক পেনাল্টি মিস করেন—পেনাল্টি শুটআউট ছাড়া বিশ্বকাপে অষ্টমবার পেনাল্টি নেওয়ার মধ্যে চতুর্থ মিস; এই “অদ্ভুত রেকর্ডে”ও তিনি ইতিহাসের প্রথম। কিন্তু ৭৯ মিনিটে রোমেরোকে অ্যাসিস্ট দিয়ে এক গোল ফেরান, ৮৩-এ নিজে শট করে সমতা, ইনজুরি টাইমে এনজোর বিজয়ী গোল। ৩-২—অবিশ্বাস্য কামব্যাক।
কোয়ার্টারফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাকঅ্যালিস্টারের হেডে অ্যাসিস্ট—বিশ্বকাপে তাঁর দশম অ্যাসিস্ট, ইতিহাসের অ্যাসিস্ট তালিকার শীর্ষে। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ৩-১-এ সেমিতে ওঠে, এক টুর্নামেন্টে টানা ছয় জয়ের দলীয় রেকর্ড গড়ে।
সেমিফাইনালের ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহাকাব্যে এক গোল পিছিয়ে থেকে মেসি পাল্টা আক্রমণের হর্ন বাজান। বারবার ডিবল করে ইংল্যান্ডের রক্ষা ভেঙে, সাত মিনিটের মধ্যে বাঁ পায়ে এনজোর দূরপাল্লার গোলে অ্যাসিস্ট, ডান পায়ে লাউতারোর হেডে বিজয়ী অ্যাসিস্ট। আবারও চরম সংকট থেকে উল্টে, টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনাল।
সাত ম্যাচে আট গোল চার অ্যাসিস্ট—দুটোই ব্যক্তিগত বিশ্বকাপ রেকর্ড। ম্যাচ শেষে এক আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিক অনুরোধ করেন “জাতীয় দল থেকে কখনো অবসর নেবেন না”; মেসির জবাব:
“আমি এখন শুধু এই মুহূর্ত উপভোগ করতে চাই। ফাইনালের ফল যাই হোক, এই পথের প্রতিটি সময়কে লালন করতে চাই।”

গল্পের শেষ থেমে থাকে ২০ জুলাইয়ের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখে, উনিশ বছর আগে নিজেই বাথটাবে “আশীর্বাদ” করা ইয়ামালের মুখে, ৩৯ বছর বয়সী মেসি বিশ্বকাপ মঞ্চে বিদায়ী অভিনয় শেষ করেন।
অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও তিনি আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু একজন কম খেলা ও নব্বই মিনিটে শূন্য শটের প্রেক্ষাপটে একা অলৌকিক কিছু ঘটানো সম্ভব হয়নি।
ম্যাচ শেষে ইয়ামাল, গার্সিয়া, গাভিসহ স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা এসে নিঃসঙ্গ মেসিকে জড়িয়ে ধরেন। লা মাসিয়ার এই ছেলেরা মেসিকে দেখে বড় হয়েছেন, আজ আবার বিশ্বকাপের মাঠে আইডলের মুখোমুখি। এই মুহূর্তে মেসির জন্য কিছুটা আক্ষেপের শেষাংশ উষ্ণতা ও উত্তরাধিকারে ভরে ওঠে।
বিশ বছর ধরে মেসি বিশ্বকাপকে যে উত্তর দিয়েছেন, তা এক পাতা পূর্ণ পরিসংখ্যান: ৩৪ ম্যাচ, ২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট—সরাসরি ৩০ গোলে অংশ নেওয়া ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়।
২০০৬ থেকে ২০২৬—মেসির ছয় বিশ্বকাপে ছিল কিশোরের উদ্দীপনা, ছিল শূন্য ফসল, ছিল এক পা দূরে থাকা, ছিল সিংহাসনে বসা, আর শেষে বৃদ্ধ ঘোড়ার জেদ।
এই বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে মেসি আর্জেন্টিনার সব খেলোয়াড় ও কর্মীদের এক গ্রুপ ছবি পোস্ট করে গভীরভাবে লেখেন:

“এই বছরগুলোর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কখনোই শুধু খেতাবগুলো ছিল না—ছিল পুরো যাত্রা।”

“এই দলের সাথে দৈনন্দিন ছোটখাটো মুহূর্ত ভাগ করা, একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, কঠিন সময়ে একে অপরকে ধরে রাখা, আর প্রতিটি পদক্ষেপ উপভোগ করা।”

“প্রত্যেক সহকর্মীকে ধন্যবাদ, কোচিং স্টাফকে ধন্যবাদ, প্রতিদিন নিঃশব্দে কাজ করা সবাইকে ধন্যবাদ—যাঁরা এই জাতীয় দলকে সবসময় এক বড় পরিবারের মতো রেখেছেন।”

“কাল যাই ঘটুক, এই দল ইতিমধ্যে এমন এক গল্প লিখেছে যা আমরা কখনো ভুলব না, কেউ মুছে ফেলতেও পারবে না।”

হ্যাঁ, আমরা এতদিন মেসিকে সোনার কাপ তুলতে চেয়েছিলাম। পরে বুঝেছি…

তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই কিংবদন্তি।






